চীন সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান সংকট ছাপিয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনর্গঠনই প্রধান লক্ষ্য

চীন সফরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল এয়ারফোর্স ওয়ানে করে বেইজিং পৌঁছান তিনি। সফরকালে ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির এ বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। কারণ কয়েক বছর ধরে চলা বাণিজ্যযুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটন ও বেইজিং এখন তাদের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ খুঁজছে। তবে এ সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু বাণিজ্য নয়, বরং ইরান যুদ্ধও বড় ছায়া ফেলেছে। এছাড়া দুইদিনের বৈঠকে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, তাইওয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের ইস্যুও আলোচনায় উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গতকাল বেইজিংয়ে পৌঁছার পর উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যান ঝেং। এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে নামার পর বর্ণিল আয়োজনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানো হয়। এ সময় ট্রাম্পের সঙ্গে তার ছেলে এরিক ট্রাম্প, পুত্রবধূ লারা ট্রাম্প এবং সফরসঙ্গী হিসেবে স্পেস এক্সের প্রধান ইলোন মাস্ককেও দেখা গেছে। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করলেও তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি লিমুজিনে চড়ে হোটেলের উদ্দেশে রওনা হন। তবে সফরের মূল অংশ শুরু হবে আজ থেকে। আজ ও আগামীকাল প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার কয়েক দফায় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

২০১৭ সালে নিজের প্রথম মেয়াদেও ট্রাম্প চীন সফর করেছিলেন। প্রায় এক দশক পর আবারো তিনি বেইজিংয়ে গেলেও এবারকার বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সময় চীন ছিল মূলত রফতানিনির্ভর উৎপাদন শক্তি। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও প্রযুক্তি অবরোধ মোকাবেলা করে চীন নিজেকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছে। একই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজের ক্ষমতার মেয়াদ বাড়িয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে আবার হোয়াইট হাউজে ফিরেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে ইরান। কারণ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করেছে। চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়ায় বিষয়টি বেইজিংয়ের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান ইস্যুতে শি জিনপিংয়ের সহায়তার প্রয়োজন নেই। ট্রাম্পের এ সফরে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান ইস্যুও গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি চীনকে বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য তাদের বাজার আরো উন্মুক্ত করার আহ্বান জানাবেন। এসব কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীরাও তার সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন। অন্যদিকে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে গত অক্টোবরে হওয়া ‘বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো, যা দুই দেশের মধ্যে শুল্ক বৃদ্ধির উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমিয়েছিল। এছাড়া তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পারে বেইজিং। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি রফতানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল, বৈদ্যুতিক গাড়িসহ চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং তাইওয়ান নীতিতে পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারে বেইজিং। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য ও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার মতো প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করবে বেইজিং।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সংবেদনশীল নয় এমন পণ্যের জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে পারে। সম্ভাব্য এ ব্যবস্থার আওতায় উভয় দেশ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের তালিকা নির্ধারণ করতে পারে, যেগুলোর ওপর শুল্ক কমিয়ে জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট রেড লাইন অতিক্রম না করেই পারস্পরিক বাণিজ্য চালানো সম্ভব হবে। ‘বোর্ড অব ট্রেড’ নামে পরিচিত এ ধারণা প্রথম মার্চে উত্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।

ট্রাম্প-শি বৈঠকে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে বড় ধরনের কোনো সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এআই প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে অনেক বিশ্লেষক নতুন ধরনের ‘প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ক্লদ নির্মাতা অ্যানথ্রপিকের শক্তিশালী ‘মিথোস’ মডেল উন্মোচনের পর প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়েছে।

তবে ট্রাম্পের প্রতিনিধি দলে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং ও হোয়াইট হাউজের প্রযুক্তি উপদেষ্টা মাইকেল ক্রাটসিওসের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বৈঠকে এআই ও এনভিডিয়ার শক্তিশালী এইচ২০০ চিপ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এআই সংলাপের একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর প্রস্তাবও দিয়েছে বলে জানা গেছে।

আরও